হাওড়া: ৮৩ বছর পার করে আজও অটল দাঁড়িয়ে রয়েছে এই সেতু। ১৯৪৩ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি, জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছিল হুগলি নদীর উপর নির্মিত ঐতিহাসিক হাওড়া ব্রিজ।(Howrah Bridge) স্বাধীনতার আগেই তৈরি হওয়া এই সেতু আজও বাংলার গর্ব, ভারতের ইঞ্জিনিয়ারিং দক্ষতার এক উজ্জ্বল নিদর্শন।
হাওড়া ব্রিজ, যা সরকারি ভাবে পরিচিত ‘রবীন্দ্র সেতু’ নামে, বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত ক্যান্টিলিভার ব্রিজ। প্রতিদিন প্রায় এক লক্ষের বেশি যানবাহন এই সেতু দিয়ে যাতায়াত করে। পাশাপাশি লক্ষ লক্ষ মানুষ পায়ে হেঁটে পার হন এই ব্রিজ। সকাল-সন্ধ্যার ব্যস্ত কলকাতার জীবন যেন এই সেতুকে ঘিরেই আবর্তিত হয়। এই ব্রিজের ইতিহাস কিন্তু আরও গভীরে প্রোথিত। ১৮৭৪ সালে প্রথমবার হাওড়া ও কলকাতাকে যুক্ত করা হয়েছিল একটি ভাসমান কাঠের পুন্টন ব্রিজের মাধ্যমে, যা পরিচিত ছিল হুগলি সেতু নামে। কিন্তু শহরের জনসংখ্যা ও যানবাহনের চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই ব্রিজ অচল হয়ে পড়ে। তখনই প্রয়োজন দেখা দেয় একটি স্থায়ী ও শক্তিশালী সেতুর।
১৯৩০ সাল নাগাদ ক্যান্টিলিভার নকশায় নতুন সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এটি ছিল সেই সময়ের অন্যতম আধুনিক ও ঝুঁকিপূর্ণ ইঞ্জিনিয়ারিং প্রকল্প। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কঠিন সময়ের মধ্যেও কাজ থামেনি। দীর্ঘ প্রায় এক দশকের পরিশ্রমের পর ১৯৪২ সালে হাওড়া ব্রিজের(Howrah Bridge) নির্মাণ সম্পূর্ণ হয়। এই সেতুর সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হল এর নির্মাণ কৌশল। সম্পূর্ণ ব্রিজটি তৈরি হয়েছে কোনও রকম নাট বা বল্টু ব্যবহার না করেই। রিভেটিং পদ্ধতিতে জোড়া দেওয়া হয়েছে হাজার হাজার ইস্পাতের অংশ। এই প্রযুক্তি আজও ইঞ্জিনিয়ারিং জগতের কাছে এক অনন্য উদাহরণ।
হাওড়া ব্রিজ নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছিল প্রায় ২৬ হাজার টন ইস্পাত। প্রথম দিকে কিছু ইস্পাত বিদেশ থেকে আনা হলেও, পরবর্তী সময়ে সিংহভাগ অর্থাৎ প্রায় ২৩ হাজার টন ইস্পাত সরবরাহ করে ভারতের টাটা গোষ্ঠী। স্বদেশি শিল্পের এই ভূমিকা হাওড়া ব্রিজকে শুধু একটি স্থাপত্য নয়, বরং আত্মনির্ভর ভারতের প্রতীক করে তুলেছে। এক সময় এই ব্রিজ দিয়ে চলাচল করত কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ট্রাম। আজও ব্রিজের উপর ট্রাম লাইনের অস্তিত্ব রয়েছে, যা অতীত দিনের স্মৃতি বহন করে। ১৯৬৫ সালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সম্মানে হাওড়া ব্রিজের নামকরণ করা হয় ‘রবীন্দ্র সেতু’। তবে সাধারণ মানুষের কাছে এটি আজও হাওড়া ব্রিজ নামেই বেশি জনপ্রিয়।




