‘ভারতের কৃষক, যুবা কখনও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে নিজের সমস্যার কথা বলতে পারেন না৷ কিন্তু ম্যাডি শর্মার মতো আন্তর্জাতিক বিজনেস ব্রোকার ইউরোপিয় সাংসদদের লিখতে পারেন, ভারতে আসুন, খরচ আমরা দেব৷’ মুর্শিদাবাদের শ্রমিকরা যখন জঙ্গীদের হাতে কাশ্মীরে মারা যাচ্ছেন, তখন ম্যাডি শর্মা আয়োজিত ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের (ইইউ) সাংসদদের কাশ্মীর সফর নিয়ে ঠিক এই ভাষাতেই টুইট-বোমা নিক্ষেপ করলেন কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর বঢরা।
পাশাপাশি, কে এই ম্যাডি শর্মা, যিনি ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের (ইইউ) সাংসদদের নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করান, তারপর কাশ্মীর নিয়ে গিয়ে সেখানে ঘুরিয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করান? প্রধানমন্ত্রী বলুন, এই ম্যাডি শর্মা কে? কী করে প্রধানমন্ত্রী তাঁকে সময় দেন? কেন বিদেশ মন্ত্রককে অন্ধকারে রাখা হল? কার নির্দেশে অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহে মোদির সঙ্গে বিদেশি সাংসদদের বৈঠকের লিখিত প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ম্যাডি? এবং ম্যাডির আয়োজনের নেপথ্যে টাকা খরচ করল কে? এমনই একগুচ্ছ প্রশ্ন তুলেছে কংগ্রেস।
তাদের দাবি, এই সকল প্রশ্নের জবাব দিতে হবে খোদ প্রধানমন্ত্রীকে। দিল্লীতে সাংবাদিক বৈঠক করে এই ইস্যুতে মোদী সরকারকে রীতিমতো তুলোধোনা করেছেন কংগ্রেস নেতা রণদীপ সিং সুরজেওয়ালা। গতকাল তিনি সরাসরি এই অভিযোগ তুলেছেন যে, কাশ্মীর সফরের সময় আমাদের দেশের সংসদ সদস্য ও বিরোধী নেতাদের আটক করে বিমানবন্দর থেকেই ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে অজানা এক আন্তর্জাতিক বিজনেস ব্রোকারের আয়োজিত ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যদের ব্যক্তিগত সফরের জন্য মোদী সরকার লাল কার্পেট পেতে দিচ্ছে।
তাঁর দাবি, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাংসদ দলকে কাশ্মীরে ডেকে আনার সিদ্ধান্ত দেশের ৭২ বছরের ঘোষিত নীতির বিরোধী। মোদী সরকার ভারতের কূটনীতি ‘ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ব্রোকার’ সংস্থার কাছে বন্ধক রেখেছে। এই সফর আসলে সরকারের জনসংযোগ-চমক। যার নেপথ্যে রয়েছেন ম্যাডি শর্মা। সুরজেওয়ালার প্রশ্ন, প্রধানমন্ত্রী কি বলবেন এই ম্যাডি শর্মা কে? তাঁর সংস্থার সঙ্গে বিজেপির যোগ কোথায়? ব্যক্তিগত সফরে আসা ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কীভাবে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ করিয়ে দিচ্ছেন তিনি? এই সফরের জন্য টাকা কোথা থেকে এসেছে? বিদেশ মন্ত্রককে কেন সম্পূর্ণভাবে দূরে সরিয়ে রাখা হল?
সুর চড়িয়ে নিজের টুইটে প্রিয়াঙ্কা লিখেছেন, ‘দেশের বেকার কৃষক ও বেকার যুবকের কাছে এই সুবিধে নেই যে তারা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে পারে। সমস্যার কথা শোনাতে পারে। কিন্তু ম্যাডি শর্মা নামে এক আন্তর্জাতিক বিজনেস ব্রোকার গর্বের সঙ্গে লিখতে পারেন, ভারতে আসুন, আমরা আপনাদের খরচ বহন করব। প্রধানমন্ত্রীর দফতরে আমার যোগাযোগ আছে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আপনাদের সাক্ষাৎ করাব। এই বিজনেস ব্রোকারের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর দফতরের যোগাযোগ গড়ে উঠল কীভাবে?’ এমনকী ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদের এই সফরের বিরুদ্ধে সুর চড়িয়েছে বিজেপির শরিকদল শিবসেনাও।
মহারাষ্ট্রে সরকার গঠন নিয়ে বিজেপি-শিবসেনার ঠান্ডা লড়াই জারি রয়েছে। এরই মধ্যে কাশ্মীরে বিদেশি প্রতিনিধিদের সফর নিয়ে মোদী সরকারকে তুলোধোনা করে শিবসেনার মুখপত্র ‘সামনা’য় বলা হয়েছে, কাশ্মীর কোনও আন্তর্জাতিক ইস্যু নয়। কাশ্মীর ইস্যুকে রাষ্ট্রসঙ্ঘে নিয়ে যাওয়ার জন্য পণ্ডিত নেহরুকে এখনও সমালোচনা করা হয়। আপনারা যদি রাষ্ট্রসঙ্ঘের হস্তক্ষেপ না চান, তাহলে বিদেশি প্রতিনিধিদের কাশ্মীরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হল কেন? ভারতের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের ক্ষেত্রে এটা কি বিদেশি হানাদারি নয়?
এ হেন বিতর্কের মাঝে আগেই ইউরোপীয় ইউনিয়নও বিবৃতি জারি করে জানিয়েছে, সাংসদ দলের কাশ্মীর সফর ‘সরকারি’ নয়। সাংসদরা ব্যক্তিগত ভাবে গেছেন। এখানেই প্রশ্ন বিরোধীদের। গত ৭২ বছর ধরে দেশের ঘোষিত নীতি হল, কাশ্মীর ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এতে কোনও তৃতীয় পক্ষ, অন্য কোনও দেশ বা কোনও ব্যক্তির মধ্যস্থতার প্রয়োজন নেই। তা হলে কার অঙ্গুলিহেলনে এই উদ্যোগ ম্যাডির? রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ইইউ দলকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করানো এবং তাঁদের কাশ্মীর ঘুরে দেখানোর সিদ্ধান্ত সরকারি হোক বা ব্যক্তিগত, বিতর্কের ফলে পুরো উদ্যোগই এখন বিশ বাঁও জলে ডুবেছে।