‘গল্পে তিনি ভালই ছিলেন গ্রীষ্ম বর্ষা শরৎ শীত
জটায়ুকে সঙ্গে নিয়ে চলে গেলেন সত্যজিৎ…’
তিনি চলে গেলেও আজও তিনি বেঁচে বিশ্বব্যাপী সাহিত্য ও চলচ্চিত্র প্রেমীদের মধ্যে। ভারতে ও বিশ্বব্যাপী বাঙালি সম্প্রদায়ের কাছে সত্যজিৎ রায় একজন সাংস্কৃতিক প্রতিভূ। ২৩ এপ্রিল তাঁর মৃত্যুতে থেমে গেছিল কলকাতার জনজীবন। হবে নাই বা কেন? তাঁর সৃষ্টিগুলো আজও প্রতিনিয়ত ভাবায়। তিনি কারোর কাছে চলচ্চিত্রকার আবার কারোর কাছে সাহিত্যিক হিসেবে অমর হয়ে আছেন। ক্যানভাসে তাঁর তুলির টান আজও রঙীন। সেই মানুষটিকে ৯৯তম জন্মবার্ষিকীতে বাঙালিরা তাঁকে আজও একইভাবে মনে রেখে দিয়েছে।
শোনা যায়, ১৯২১ সালে ২ মে কলকাতার গড়পার রোডের রায় পরিবারে যে শিশুটি জন্ম নিয়েছিল তাঁকে দেখতে আসা আত্মীয়-পরিজন থেকে প্রতিবেশীদের মধ্যে এক হাসির রোল উঠেছিল। কারণ শিশুটির মাথা ছিল স্বাভাবিকের তুলনায় লম্বা। তখন কেউ ভাবতে পারেননি সেই লম্বা মাথার শিশুটি বিশ্বের মাথাওয়ালা একজন হবে। প্রথমে শিশুটির নাম প্রসাদ রাখা হলেও আজও তিনি সুকুমারের দেওয়া নাম সত্যজিৎ হয়ে বেঁচে আছেন আমাদের মধ্যে। সত্যজিৎ রায়ের গৌরবময় পরিবারেও একসময় নেমে এসেছিল দুঃখের ছায়া। সুকুমার রায়ের মৃত্যুর দু-তিন বছর পর দেনার দায়ে গড়পারের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হয়ে যাওয়ায় সত্যজিৎ তাঁর মায়ের সঙ্গে চলে আসেন ভবানীপুরে তাঁর মামার বাড়ি। প্রায় নয় বছর বয়সে প্ৰথম স্কুলের গন্ডিতে পা রাখেন তিনি। তবে আশ্চর্যের বিষয় তিনি একধাপে প্রথমেই বালিগঞ্জ গভর্মেন্ট স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হন। শুরু প্রথাগত বিদ্যার। স্কুল ছাড়ার দশ বছর পর পুরোনো ছাত্রদের সম্মেলনে গিয়ে দরজায় মাথা ঠেকে যায় তাঁর। বারান্দা, ক্লাসরুম, বেঞ্চ সবকিছুই ছোট ছোট লেগেছিল তাঁর কাছে। মানুষের কাছে শৈশব কৈশোরের সবকিছুই হয়তো এমনই লাগে। এই সত্যিটা সেদিন তিনি উপলব্ধি করেন। স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। কলেজজীবনেই সত্যজিতের মধ্যে পাশ্চাত্য সঙ্গীত ও চলচ্চিত্রের প্রতি আগ্রহ বাড়তে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে সত্যজিতের মনে পোঁতা সেই ছোট বটগাছটা বড় হতে শুরু করে। আর আজ সেটা তাঁর ‘শাখা-প্রশাখা’ নিয়ে বাঙালির মননে গেঁথে গেছে।
সত্যজিৎ ঠিক করেন যে, বাংলা সাহিত্যের ধ্রুপদী “বিল্ডুংস্রোমান” পথের পাঁচালী-ই হবে তাঁর প্রথম চলচ্চিত্রের প্রতিপাদ্য। এ ছবি বানানোর জন্য সত্যজিৎ কিছু পূর্ব-অভিজ্ঞতাবিহীন কুশলীকে একত্রিত করেন। এ ছাড়া ছবির বেশির ভাগ অভিনেতাই ছিলেন শৌখিন। ১৯৫২ সালের শেষ দিকে সত্যজিৎ তাঁর নিজের জমানো পয়সা খরচ করে দৃশ্যগ্রহণ শুরু করেন। তিনি ভেবেছিলেন প্রাথমিক দৃশ্যগুলো দেখার পরে হয়ত কেউ ছবিটিতে অর্থলগ্নি করবেন। কিন্তু সে ধরনের আর্থিক সহায়তা মিলছিল না। পথের পাঁচালী-র দৃশ্যগ্রহণ তাই থেমে থেমে অস্বাভাবিকভাবে প্রায় দীর্ঘ তিন বছর ধরে সম্পন্ন হয়। কেবল তখনই দৃশ্যগ্রহণ করা সম্ভব হত যখন সত্যজিৎ বা নির্মাণ ব্যবস্থাপক অনিল চৌধুরী প্রয়োজনীয় অর্থের যোগান করতে পারতেন। শেষ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গসরকারের থেকে ঋণ নিয়ে ১৯৫৫ সালে ছবিটি নির্মাণ সম্পন্ন হয় ও সে বছরই এটি মুক্তি পায়। মুক্তি পাওয়ার পর পরই ছবিটি দর্শক-সমালোচক সবার অকুণ্ঠ প্রশংসা লাভ করে। তারপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয় নি তাঁকে। একের পর এক ‘মাস্টার পিস’ সৃষ্টি উপহার দিয়েছেন আমাদের। বড়দের পাশাপাশি একাধারে ছোটদের জন্য তাঁর কলম ও ক্যামেরা চলেছিল।
তাঁর হাতে অপুর জীবন পূর্ন হল। তিনি ‘ঘরে-বাইরে’ খুব ব্যস্ত ছিলেন। তাঁর কলমে ‘চারুলতা’ লেখা হলেও তাঁর সংসার আলোকিত করেছিলেন বিজয়া। তাঁর জীবনের অন্যতম অনুপ্রেরণা। ‘তিন কন্যা’ মনোবাসনা থাকলেও তাঁর একমাত্র পুত্র সন্দীপ।
শুধু চলচ্চিত্র নয়। তাঁর কলমে এসেছে অসংখ্য ছোট গল্প, ফেলুদা-প্রফেসর শঙ্কুর মত সব চরিত্র। তার পাশাপাশি তাঁর ছবি। তিনি তাঁর চিত্রনাট্য লিখতেন না আঁকতেন। এইভাবেই তিনি আজও আমাদের কাছে ‘আগন্তুক’-এর মত রহস্যময়। জীবনের শেষবেলায় চলচ্চিত্র জগতের শ্রেষ্ঠ সন্মান অস্কারও এসেছিল তাঁর ঝুলিতে। বিশ্বব্যাপী যত সন্মান আছে তিনি তাঁর জীবনকালে ও পরবর্তী সময়ে অর্জন করেছেন।
আজও তিনি পথিকৃৎ। সব চলচ্চিত্রকার আজও তাঁর কাজে অনুপ্রাণিত। বিশ্বের অধিকাংশ চলচ্চিত্র বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তকে উজ্জ্বল হয়ে আছেন তিনি। তাই শেষে বলতেই হয় ‘চলে গিয়েও তুমি বেঁচে আছো বিশ্বের মানুষের মননে…’