‘অসমে ভয়ঙ্কর আগুন নিয়ে খেলা হচ্ছে। নাগরিকপঞ্জি নিয়ে যা হচ্ছে, তা এককথায় বাঙালি খেদাও অভিযান বললেও কম হবে। সব রাজ্যে এখন রব উঠেছে, বাঙালি বের করে দাও। রাখা যাবে না বাঙালিকে। এটা কোন দেশ? বাঙালিদের জায়গা নেই বলে সব জায়গায় হুঙ্কার দেওয়া হচ্ছে। বাঙালিরা সত্যিই আজ বিপন্ন।’ মালুগ্রামে মহাপ্রভু কলোনির বাড়িতে বসে একান্ত সাক্ষাৎকারে এভাবেই জাতীয় নাগরিকপঞ্জির চূড়ান্ত খসড়া থেকে ৪০ লক্ষ নাম বাদ যাওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুললেন অসম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য ডঃ তপোধীর ভট্টাচার্য। যার মধ্যে রয়েছে তাঁর ভাইয়ের স্ত্রী শান্তা ভট্টাচার্যের নামও। দীর্ঘদিন ধরে অসমের বাঙালি এবং বাংলা ভাষার জন্য তিনি লড়ে চলেছেন। তাই এই নাগরিকপঞ্জির নামে যেভাবে বাঙালিকে ‘ব্রাত্য’ করা হচ্ছে, তা নিয়ে গর্জে উঠেছেন তিনি। এর জন্য রাজ্যের বিজেপি সরকারের রোষানলেও পড়তে হলেও, দমে যাননি তপোধীরবাবু। বললেন, ‘হিন্দি, হিন্দু, হিন্দুস্তান নীতির দাপটে যেটা এতদিন প্রচ্ছন্ন ছিল, সেটাই এখন প্রকাশ্যে আসছে। যার জেরে বাঙালি ত্রস্ত। কারণ বাঙালি এখন নিজেকে বাঙালি ভাবতে পারছে না। সন্ত্রাস, হুমকি, মগজধোলাইয়ে জেরবার হয়ে নিজেদের হিন্দু ও মুসলমান ভাবছে। কিন্তু মনে রাখতে বাঙালির পরিচয় বাঙালি। সেই পরিচয়কে কেড়ে নেওয়া যাবে না।’
দেশভাগের বছরে অসমের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী গোপীনাথ বরদলুই বলেছিলেন, ‘নিঃসন্দেহে অসম অসমিয়াদের জন্য।’ তখন মহাত্মা গান্ধী পাল্টা বলেছিলেন, ‘অসম যদি অসমিয়াদের হয়, তাহলে ভারতবর্ষটা কাদের জন্য!’ তপোধীরবাবুর আক্ষেপ, ‘দুর্ভাগ্যবশত স্বাধীনতার ৭১ বছর পর এই আত্মপ্রশ্নই ফিরে ফিরে আসছে। এখন বলা হচ্ছে, অসমে থাকতে গেলে অসমিয়াদের প্রভুত্ব নিয়ে থাকতে হবে। কেন বলতে পারেন? প্রভুত্ব কথাটি আসে কোথা থেকে? গণতান্ত্রিক ভারতবর্ষের নাগরিকরা যে যেখানে খুশি থাকতে পারেন। সেখানে কেন বাঙালিকে তাড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে? বাদ পড়ছেন না পুরনো অসমিয়ারাও!’
ডি ভোটার বা ডাউটফুল ভোটার নিয়ে অসমে যে বরাবর বিতর্ক রয়েছে, তার ঘোরতর বিরোধী তপোধীরবাবু। তাঁর দাবি, ‘ভারতের অন্য কোথাও যা নেই, বাঙালি-বিদ্বেষী অসম সরকার সেই ডি ভোটার তকমা চাপিয়ে দেয় ১৯৯৭ সালে। গত ২১ বছরেও বিষয়টির নিষ্পত্তি হয়নি বলে এই ৩ লক্ষ ৭০ হাজার সন্দেহভাজন মানুষ আজও অবাঞ্ছিত। কেন এভাবে মানুষকে ডিটেনশন সেন্টারে পাঠিয়ে দেওয়া হবে? ক্ষমতার আস্ফালনের প্রতিবাদ করলেই মানুষকে রাষ্ট্রবিরোধী বলে ঘোষণা করা হচ্ছে। এটাই কি ভারতবর্ষ? এটা সম্পূর্ণ অন্যায়।’ বলা বাহুল্য, তপোধীরবাবুর এই ধরনের প্রতিবাদকে কখনওই ভালো চোখে দেখেনি অসমের বিজেপি সরকার।
আসলে বরাক উপত্যকায় বেশিরভাগ মানুষের সঙ্গে বাংলাদেশ তথা তৎকালীন পূর্ববঙ্গের যোগসাজশ রয়েছে। আর এই মানুষগুলির প্রায় প্রত্যেকেই বাংলা ভাষাভাষী। তাই এরা উদ্বাস্তু। অভিযোগ, এই অপপ্রচারই দেশের দণ্ডমুণ্ডের কর্তাদের বোঝাচ্ছে প্রশাসন। যার ফলেই প্রথমে নাগরিকপঞ্জি থেকে নাম বাদ, তারপরে হয় ডিটেনশন কেন্দ্রে ঢুকিয়ে দেওয়া, আর নয়তো বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার হুমকি তো রয়েছেই।
তপোধীরবাবুর দাবি, ‘১৮৭৪ সালে তদানীন্তন দুর্বল অসমকে শক্তিশালী করার জন্য কাছাড়, সিলেট ও গোয়ালপাড়াকে অসমের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়। আর ১৯৪৭ সালে গণভোটের মাধ্যমে সিলেট যুক্ত হয় পূর্ববঙ্গের সঙ্গে। অর্থাৎ সিলেটে এদেশের মানুষই ছিলেন। তাঁরাই পরে বরাক উপত্যকায় এসে থাকতে শুরু করেন। তাহলে এরা কীভাবে বিদেশি হলেন? আসলে আমাদেরকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিদেশি তকমা দিয়ে তাড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে। মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ ছিল, জাতীয় নাগরিকপঞ্জির নামে কাউকে হেনস্তা করা যাবে না। কিন্তু সেটাই হচ্ছে। এতো সুপ্রিম কোর্টের অবমাননা!’
এরপরেই তপোধীরবাবুর প্রশ্ন, ‘ক্ষুদিরাম বসু, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর বাঙালির এটাই কি প্রাপ্য? আমরা বাংলায় কথা বলি, এটাই কি আমাদের দোষ? প্রত্যেক রাজ্যের সরকার জানতে চাইছে, জাতীয় নাগরিকপঞ্জি কীভাবে হচ্ছে? কারণ এতে কত বাঙালি আছে, তা জানা যাবে। খেদাও অভিযান জোরদার করা যাবে। দেশভাগের সময় এত সঙ্কট ছিল না, যা এখন হচ্ছে। এককথায় বলতে পারি, বাঙালিদের জন্য বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ সময় অত্যন্ত ভয়ানক হতে চলেছে।’
(সংগৃহীত)