নন্দীগ্রাম: শরীরটা আর সায় দেয় না। কয়েক মিনিট দাঁড়ালেই মাথা ঘোরে, হাঁটতে গেলেই বুক ধড়ফড় করে ওঠে। নন্দীগ্রাম ২ নম্বর সেবাশ্রয়(Sebaashray Camp) শিবিরে এমনই অসহায় অবস্থায় মাটিতে বসে পড়েছিলেন শুভাশিস শাসমল। পাশে স্ত্রী পুতুল শাসমল। দু’জনের মুখেই উৎকণ্ঠা কারণ শুভাশিসের দু’টি কিডনিই সম্পূর্ণ বিকল।
পূর্ব মেদিনীপুরের পটাশপুর এলাকার বাসিন্দা শুভাশিস পেশায় দিনমজুর। অন্যের জমিতে কাজ করে কোনওরকমে চলত সংসার। বাড়িতে বৃদ্ধ বাবা-মা, স্ত্রী এবং দু’টি নাবালক সন্তান। কিন্তু কিডনি বিকলের পর থেকে কাজ করা একেবারেই বন্ধ। সংসারের আয়ের পথ রুদ্ধ। একের পর এক হাসপাতালে চিকিৎসা করিয়ে জানা যায়, বাঁচতে গেলে কিডনি প্রতিস্থাপন ছাড়া আর কোনও উপায় নেই। চিকিৎসার সম্ভাব্য খরচ প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা।
এই বিপুল অঙ্কের টাকা ‘দিন আনি দিন খাই’ পরিবারের পক্ষে কল্পনারও বাইরে। ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছিল গোটা পরিবার। মৃত্যুর জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়ে যাচ্ছিলেন শুভাশিস। স্ত্রী পুতুল শাসমল স্বামীকে বাঁচাতে নিজেই একটি কিডনি দিতে রাজি। ম্যাচ করলে কোনও দ্বিধা ছাড়াই দান করবেন। কিন্তু প্রশ্ন একটাই চিকিৎসার টাকা আসবে কোথা থেকে?
এই চরম সংকটের মধ্যেই শেষ ভরসা হয়ে ওঠে নন্দীগ্রামের সেবাশ্রয় শিবির।(Sebaashray Camp) ভরসা নিয়ে স্ত্রীকে সঙ্গে করে শিবিরে আসেন শুভাশিস। কিন্তু শিবিরে তখন মানুষের ঢল। চারদিকেই দীর্ঘ লাইন। দুর্বল শরীর নিয়ে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে মাটিতে বসে পড়েন তিনি। কিছুক্ষণ পর বসে থাকাও তাঁর পক্ষে কষ্টকর হয়ে ওঠে।
বিষয়টি জানানো হয় তমলুক সাংগঠনিক জেলার সভাপতি সুজিত রায় এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কাউন্সিলর সুশান্ত ঘোষকে। মুহূর্তের মধ্যেই মানবিকতার পরিচয় দিয়ে তাঁরা শুভাশিস ও তাঁর স্ত্রীকে চিকিৎসকের কাছে পৌঁছে দেন।
ডাক্তারি পরীক্ষার পর জানানো হয়, এটি একটি জটিল রেফারেল কেস। বাইরের হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে হবে এবং একাধিকবার ফলোআপের প্রয়োজন হবে। তবে তাঁদের স্পষ্টভাবে আশ্বস্ত করা হয়—চিন্তার কোনও কারণ নেই। সমস্ত বিষয় সংশ্লিষ্ট মহলে জানানো হয়েছে। চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়া হবে।
এই আশ্বাস পেতেই যেন দীর্ঘদিনের জমে থাকা আতঙ্ক ঝরে যায় শুভাশিস ও পুতুলের মুখ থেকে। শিবিরে ঢোকার সময় যে দম্পতির চোখে ছিল ভয় আর অনিশ্চয়তা, ফেরার সময় তাঁদের চোখে ছিল ভরসা ও বেঁচে থাকার আশ্বাস।
শুধু শুভাশিস নন, প্রতিদিন নন্দীগ্রাম ১ ও ২ নম্বর সেবাশ্রয় শিবিরে হাজার হাজার মানুষ চিকিৎসা পরিষেবা পাচ্ছেন। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলছে এই শিবির। চোখ, দাঁত, হাড়, শিশু ও জটিল রোগ—সব ক্ষেত্রেই মিলছে বিনামূল্যের চিকিৎসা ও ওষুধ। প্রয়োজনে রেফারেল কেস হিসেবে বাইরের হাসপাতালে অস্ত্রোপচার ও উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।
এই মানবিক উদ্যোগের নেপথ্যে রয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর উদ্যোগেই সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছেছে উন্নত চিকিৎসা পরিষেবা। নন্দীগ্রামের মানুষের মুখে আজ হাসি। কারণ তাঁদের বিশ্বাস—সেবাশ্রয় মানেই ভরসা, সেবাশ্রয় মানেই বাঁচার আশ্বাস।




