কলকাতা: ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন(SIR) প্রক্রিয়া ঘিরে আতঙ্কের জেরে পুরুলিয়ায় আত্মঘাতী হলেন এক আদিবাসী বৃদ্ধ। আর সেই ঘটনায় নির্বাচন কমিশনের নামে আত্মহত্যার প্ররোচনা ও অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের ধারায় মামলা রুজু করল পাড়া থানার পুলিশ। ঘটনাকে কেন্দ্র করে জঙ্গলমহলে তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে।
মৃত আদিবাসী বৃদ্ধের নাম দুর্জন মাঝি (৮২)। তিনি পাড়া ব্লকের আনাড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের চৌতলা গ্রামের বাসিন্দা। পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, গত ২৯ ডিসেম্বর তিনি টোটো রিজার্ভ করতে যাবেন বলে বাড়ি থেকে বেরোন। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই বাড়ির পাশের রেললাইনে তাঁর মৃতদেহ উদ্ধার হয়। পুলিশ প্রাথমিক তদন্তে জানতে পারে, ওই দিনই তাঁর এসআইআর(SIR) শুনানির দিন ছিল পাড়া ব্লক অফিসে।
ভোটার তালিকায় নাম সংক্রান্ত নোটিশ পাওয়ার পর থেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন দুর্জন মাঝি। বৃদ্ধ বয়সে ব্লক অফিসে যাওয়া, আধিকারিকদের সামনে হাজিরা, কাগজপত্র দেখানো—এই সমস্ত বিষয় তাঁকে চরম দুশ্চিন্তার মধ্যে ফেলে দেয় বলে জানিয়েছে পরিবার।
মৃতের ছেলে কানাই মাঝি, যিনি পেশায় দিনমজুর, ওই দিন রাতেই পাড়া থানায় নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ জানান। যদিও প্রথমে পুলিশ সেই অভিযোগের ভিত্তিতে শুধু জেনারেল ডায়েরি করে। কিন্তু দীর্ঘ ১৭ দিন পর অবশেষে সেই অভিযোগের প্রেক্ষিতেই নির্বাচন কমিশনের নামে মামলা রুজু করা হয়।
পাড়া থানার এফআইআরে নির্বাচন কমিশনের অজ্ঞাতপরিচয় আধিকারিক ও আধিকারিকদের বিরুদ্ধে আত্মহত্যার প্ররোচনা এবং অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের ধারা যুক্ত করা হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। ইতিমধ্যেই পরিবারের সদস্যদের বয়ান নেওয়া হয়েছে এবং এসআইআর নোটিশ সংক্রান্ত নথি সংগ্রহ করা হয়েছে।
এই ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক চাপানউতোরও শুরু হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুরুলিয়া সফরের ঠিক আগেই মামলা রুজু হওয়ায় বিষয়টি বাড়তি গুরুত্ব পাচ্ছে।
তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক ও পাড়া বিধানসভা কেন্দ্রের কো-অর্ডিনেটর সুজয় বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন,
“এসআইআর প্রক্রিয়া সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। ওই আদিবাসী বৃদ্ধ শুধুমাত্র নোটিশের ভয়েই আত্মহত্যা করেছেন। এই ঘটনায় নির্বাচন কমিশনের প্ররোচনা রয়েছে।”
এই ঘটনার মধ্যেই মানবাজার থানার পাথরকাটা গ্রামে আরও এক আদিবাসী যুবকের আত্মহত্যার ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। মৃত যুবকের নাম দেবরাজ ওরাং (৩২)। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ভোটার তালিকায় ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ দেখিয়ে শুনানির নোটিশ আসার পর থেকেই মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত রবিবার রাতে আত্মঘাতী হন দেবরাজ।
দেবরাজের পরিবারও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগ দায়ের করার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে।
পুরুলিয়া জেলা তৃণমূলের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট তথা আদিবাসী নেতা গুরুপদ টুডু বলেন, “এসআইআর প্রক্রিয়া আদিবাসী সমাজের মধ্যে গভীর আতঙ্ক তৈরি করেছে। অনেকেই পড়তে লিখতে জানেন না। নোটিশের ভাষা বুঝতে না পেরে নাম কেটে যাবে ভেবে ভেঙে পড়ছেন। এই মানসিক চাপই মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।”
জঙ্গলমহলের বিস্তীর্ণ এলাকায় এখন এসআইআর নোটিশ মানেই আতঙ্ক। বুড়ো-বৃদ্ধ থেকে যুবক—সকলেই দুশ্চিন্তায় ভুগছেন। প্রশাসনের তরফে সচেতনতা বা সাহায্যের উদ্যোগ না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে।




