কলকাতা: দীর্ঘদিন ধরে গুটখা সেবনের ভয়াবহ পরিণতি যে কতটা মারাত্মক হতে পারে, তারই বাস্তব উদাহরণ হয়ে উঠলেন হুগলির আরামবাগের বাসিন্দা ৫৭ বছরের সীতারাম দাস। দিনের পর দিন গুটখা সেবনের অভ্যাস থেকেই তাঁর মুখের ভিতরে তৈরি হয়েছিল একটি ছোট ঘা। প্রথমে বিষয়টিকে খুব একটা গুরুত্ব না দিলেও ধীরে ধীরে সেই ক্ষত ভয়ংকর রূপ নেয়। পরে চিকিৎসকের কাছে গেলে জানা যায়, সেটিই ছিল মুখের ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণ।
স্থানীয় একটি হাসপাতালে পরীক্ষা করালে বায়োপসির রিপোর্টে ধরা পড়ে ওরাল ক্যানসার। তখন ক্যানসার তাঁর ডানদিকের চোয়ালের দাঁতের গোড়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল এবং গলার লিম্ফনোডেও সংক্রমণ পৌঁছে গিয়েছিল।
চিকিৎসার জন্য বেসরকারি হাসপাতালে যোগাযোগ করলে কয়েক লক্ষ টাকা খরচের কথা জানানো হয়। এত বিপুল অর্থ জোগাড় করা তাঁর পরিবারের পক্ষে সম্ভব ছিল না। সেই সময়ই আশার আলো হয়ে ওঠে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী সরকারি হাসপাতাল নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল।(NRS Hospital)
সেখানে শল্য চিকিৎসা বিভাগের ইউনিট ফোরের প্রধান অধ্যাপক ডা. উৎপল দে-র তত্ত্বাবধানে এই জটিল অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ডা. উৎপল দে জানান, সীতারামবাবুর ডানদিকের চোয়ালের দু’নম্বর থেকে চার নম্বর দাঁতের গোড়ায় ক্যানসার ছড়িয়ে পড়েছিল। রোগীকে বাঁচাতে হলে আক্রান্ত অংশসহ পাঁচটি দাঁত কেটে বাদ দেওয়া ছাড়া অন্য কোনও উপায় ছিল না।
অস্ত্রোপচারের সময় শুধু চোয়ালের আক্রান্ত অংশ বাদ দেওয়াই নয়, গলার লিম্ফনোড থেকেও ক্যানসারের কোষ অপসারণ করতে হয়েছে। ওই অংশের কাছ দিয়েই রয়েছে মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহকারী গুরুত্বপূর্ণ ধমনী। ফলে অত্যন্ত সতর্কতা ও দক্ষতার সঙ্গে এই জটিল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করতে হয়।
সকাল ৯টা থেকে শুরু হওয়া এই দীর্ঘ অস্ত্রোপচার শেষ হয় বিকেল সাড়ে পাঁচটায়। প্রায় সাড়ে আট ঘণ্টা ধরে চলা এই অপারেশনের পর চিকিৎসকেরা রোগীর প্রাণ বাঁচাতে সক্ষম হন। কিন্তু শুধু চোয়াল কেটে বাদ দিলেই কাজ শেষ নয়, মুখের স্বাভাবিক গঠন ফিরিয়ে আনাও ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।
রোগীর চোয়াল নতুন করে তৈরি করতে ব্যবহার করা হয় টাইটেনিয়াম প্লেট। স্ক্রু দিয়ে সেটি বসানো হয় কাটা অংশে। পরে বুকের পেশি ও চামড়া নিয়ে সেই প্লেট ঢেকে দেওয়া হয়, যাতে ভবিষ্যতে রেডিওথেরাপির সময় কোনও সমস্যা না হয়।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়, এই সম্পূর্ণ চিকিৎসা হয়েছে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। যেখানে বেসরকারি হাসপাতালে এই অস্ত্রোপচারের খরচ কয়েক লক্ষ টাকা, সেখানে সরকারি হাসপাতালেই(NRS Hospital) বিনা খরচে নতুন জীবন ফিরে পেয়েছেন সীতারামবাবু।
ডা. উৎপল দে বলেন, “গুটখার প্যাকেটে যে সতর্কতামূলক ছবি দেওয়া থাকে, সীতারামবাবুর অবস্থাও প্রায় সেই রকম হয়ে গিয়েছিল। তবুও মানুষ সচেতন হন না। গুটখা ও তামাকজাত দ্রব্য থেকে দূরে না থাকলে এই ভয়াবহ রোগ থামানো সম্ভব নয়।”




