বিয়ের পরে মেয়েরা কনকাঞ্জলি দিয়ে মায়ের যাবতীয় ঋণ শোধ করে। কিন্তু বসিরহাটের বাসিন্দা ঐন্দ্রিলা তাঁর মাকে দিলেন সম্পূর্ণ আলাদা এক কনকাঞ্জলি। মাকে বাঁচাতে নিজের লিভারের অংশ মাকে দান করলেন তিনি। মঙ্গলবার এসএসকেএম হাসপাতালে মেয়ের লিভারের অংশ নিয়ে নতুন জীবনের পথে পা বাড়ালেন সিরোসিস অফ লিভারে আক্রান্ত বেবি ঘোষ।
শেষ ৩-৪ বছর ধরেই বমি এবং হজম সংক্রান্ত সমস্যায় ভুগছিলেন বছর ৪৪-এর বেবি দেবী। চিকিৎসার জন্য দক্ষিণ ভারত অবধি ঘুরে এলেও রোগ নিরাময় হয়নি তাঁর।তারপরে হায়দ্রাবাদে গিয়ে ধরা পড়ে সিরোসিস অফ লিভারে আক্রান্ত হয়েছেন তিনি। স্বামী সুজিত ঘোষ বলেন, ‘ওখান থেকে ফিরে আসার পর পেটে জল জমে যায়, আবার হায়দ্রাবাদে পাঠানো হলে ৭৫০ গ্রাম জল বের করা হয়। তার পর থেকে অস্ত্রোপ্রচারের দিন পর্যন্ত প্রায় ২৪ বার হায়দ্রাবাদে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।’ স্ত্রীর অবস্থার উন্নতি কোনও ভাবেই হচ্ছে না দেখে মাস তিনেক আগে এসএসকেএম হাসপাতালের প্রথিতযশা লিভাররোগ বিশেষজ্ঞ অভিজিৎ চৌধুরীর দ্বারস্থ হন সুজিত। যাবতীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানিয়ে দেওয়া হয়, বেবি একমাত্র সুস্থ হতে পারবেন লিভার প্রতিস্থাপনের মাধ্যমেই।
এরপরেই মাকে নিজের লিভারের অংশ দেবেন বলে জেদ ধরে বসেন তেইশের তরুণী। একমাত্র মেয়ের এহেন অনুরোধ প্রথমেই নাকচ করে দেন বাবা-মা। কিন্তু, মেয়ে নিজের কথায় অনড় থাকে। মঙ্গলবার প্রতিস্থাপন চলাকালীন সুজিত জানান, ‘মাসখানেক আগে এক মরণোত্তর দাতার লিভার পেয়েছিলাম আমরা। কিন্তু, মেয়ে কিছুতেই তা নিতে রাজি হয়নি। ওর একটাই জেদ, মা যদি কারও লিভার পেয়ে বাঁচে, তা হলে আমার লিভারেই বাঁচবে। ওর এই মোটিভেশনে অনেকটা হাত রয়েছে ওর বিশেষ বন্ধুরও। সে এয়ারফোর্সের অফিসার। ওকে আরও উদ্ধুদ্ধ করেছে সে-ই।’ ২৩ বছরের ঐন্দ্রিলার দৃঢ়তা দেখে এসএসকেএম হাসপাতালের পোড়খাওয়া চিকিৎসকরাও অভিভুত। শেষ পর্যন্ত তাঁর জেদের কাছে হার মেনে অস্ত্রোপ্রচারের জন্য তাঁকেই প্রস্তুত করেন চিকিৎসকের। ঐন্দ্রিলার লিভারের তিন ভাগের এক ভাগ মঙ্গলবার প্রতিস্থাপন করা হয় দেবীর শরীরে। মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত পাওয়া খবর অনুযায়ী, দিল্লির বিশেষজ্ঞ প্রতিস্থাপন দলের চিকিৎসকদের সহায়তায় এসএসকেএমের চিকিৎসকেরা সফল ভাবেই সম্পন্ন করেছেন প্রতিস্থাপন। স্থিতিশীল আছেন মা-মেয়ে।
হেপাটোলজির বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডাঃ অভিজিৎ চৌধুরি জানিয়েছেন, ঐন্দ্রিলার স্বাভাবিক জীবনযাপনে কোনও অসুবিধে হবে না, সন্তানধারণ বা ভবিষ্যত জীবনেও কোনও বাধা আসবে না।’। ভোর ৬টায় শুরু হয় অস্ত্রোপ্রচার, শেষ হয় সন্ধে ৭টায়। ডাঃ অভিজিৎ চৌধুরির নেতৃত্বে হেপাটোলজি ও সার্জিক্যাল গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজি বিভাগের চিকিৎসকেরা যৌথভাবে টানা ১৩ ঘণ্টা ধরে হাসপাতালের স্কুল অফ ডাইজেস্টিভ অ্যান্ড লিভার ডিজিজেজ–এ অস্ত্রোপ্রচার চালান। মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত পাওয়া খবর অনুযায়ী, দিল্লির বিশেষজ্ঞ প্রতিস্থাপন দলের চিকিৎসকদের সহায়তায় এসএসকেএমের চিকিৎসকেরা সফল ভাবেই সম্পন্ন করেছেন প্রতিস্থাপন।
অস্ত্রোপ্রচার সম্পন্ন হওয়ার পর ডাঃ চৌধুরি বলেন, ‘’বাবা-মা সন্তানকে, স্ত্রী স্বামীকে অঙ্গ দিচ্ছেন এ রকম ঘটনা অনেক দেখেছি। কিন্তু, কোনও সন্তান জেদ ধরে নিজের মাকে লিভারের অংশ দান করে প্রাণে বাঁচাতে এগিয়ে আসছে, এমন অভিজ্ঞতা আমার আগে হয়নি। মেয়েটির সঙ্গে বহুবার কথা বলার সুবাদে বলতে পারি, ও কিন্তু শুধুই ইমোশনাল নয়। অত্যন্ত প্র্যাক্টিক্যাল মেয়েও।’ ঐন্দ্রিলা নিজেও খুব খুশি তাঁর কথা সে রাখতে পেরেছে বলে। বর্তমান দিনে যেখানে মা বাবার বয়স হলে অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের না দেখাশোনা করার ঘটনা শুনতে পাওয়া যায়, সেরকম এক সময়ে এই ঘটনায় অনন্য নজির সৃষ্টি করল ঐন্দ্রিলা।




