যে কোন রোগের ক্ষেত্রে চটজলদি নিরাময়ের জন্যে অনেক সময়েই চিকিৎসকরা রুগীদের অ্যান্টিবায়োটিক খাবার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। যদিও এই অ্যান্টিবায়োটিকের ফলে আমাদের শরীরে বেশ কিছু নেতিবাচক প্রভাব পড়ে যার মধ্যে দুর্বলতা অন্যতম। এবার চিকিৎসকদের যখন খুশি অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার প্রবণতার ওপর লাগাম টানতে চলেছে রাজ্য সরকার। চিকিৎসাশাস্ত্রের প্রায় ২০টিরও বেশি পরিচিত অসুখ বিসুখের ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া নিয়ে গাইড লাইন তৈরি হয়েছে সরকারি উদ্যোগে।
বেশ কিছু নামকরা ক্লিনিশিয়ান এই গাইডলাইন তৈরির উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেছেন, ‘মুড়ি মুড়কির মত অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া আটকাতে এই ধরণের গাইডলাইন ভীষণ দরকার ছিল। তবে তা যেন কখনই চিকিৎসকদের চিকিৎসার স্বাধিকারকে ক্ষুণ্ণ না করে সেদিকেও খেয়াল রাখা দরকার।’ বিখ্যাত ফিজিশিয়ান ডঃ সুকুমার মুখোপাধ্যায় সোমবার দিন জানিয়েছেন, ‘গাইডলাইন ভালো। কিন্তু, মনে রাখতে হবে, এটা চিকিৎসাশাস্ত্র। কেস অনুযায়ী, পরিস্থিতি অনুযায়ী ডাক্তারকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। পরিবর্তনও করতে হয়। তাই খোলা মনে গাইডলাইন ব্যবহারের ক্ষমতা দেওয়া উচিত। কখনও যেন মনে না হয়, চাপিয়ে দেওয়া হল। সেক্ষেত্রে রুগীরাই সঠিক পরিষেবা পাবেন না’।
রাজ্য স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ ইন্সটিটিউটের অধিকর্তা নামকরা ফার্মাকোলজিস্ট ডঃ কৃষ্ণাংশু রায়, যার ওপর এই গাইডলাইন তৈরির দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিল, তিনিও এটিকে খুব কার্যকর বলে মনে করছেন। তিনি জানিয়েছেন, অন্য কোন রাজ্যে এমন গাইডলাইন আছে কিনা আমি জানিনা, মুখ্যমন্ত্রী খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ নিয়েছেন। আমি আশা রাখব, চিকিৎসকরা এটি মেনে চলবেন।’
স্বাস্থ্য দফতর সূত্রে জানা গেছে, এই কাজটি যথেষ্ট কঠিন ছিল। কোন সরকারি হাসপাতালে কী রোগে কোন অ্যান্টিবায়োটিক বেশি বেশি দেওয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ ইনস্টিটিউট এজন্য একটি মাল্টিডিসিপ্লিনারি এক্সপার্ট কমিটি গঠন করে। শুধু তাই নয়, উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের ছ’টি হাসপাতালে প্রেসক্রিপশন অডিট শুরু হয়। সেখান থেকে তথ্য পেয়ে প্রস্তুত হয় খসড়া তালিকা। তা পাঠানো হয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দিল্লির এক খ্যাতনামা বিশেষজ্ঞকে। তাঁর উপস্থিতিতে এক্সপার্ট কমিটির বৈঠকে চূড়ান্ত ঝাড়াইবাছাইয়ের কাজ শুরু হয়। এরপর গাইডলাইনটি পাঠানো হয় তিন নামকরা রিভিউয়ারের কাছে তাঁদের চূড়ান্ত মতামত জানতে। সেসব আসার পর গাইডলাইনটি ছাপতে গিয়েছে। বাস্তবায়িত হওয়া স্রেফ সময়ের অপেক্ষা।
গাইডলাইন তৈরির সময় যেসব বিশেষজ্ঞের মতামত নেওয়া হয়, তাঁদের মধ্যে সরকারি ছাড়াও প্রাইভেট হাসপাতালের নামজাদা ডাক্তাররাও আছেন। কৃষ্ণাংশুবাবু জানান, তালিকাটি দপ্তরের ওয়েবসাইটে তুলে দেওয়া হবে। বেসরকারি হাসপাতালগুলিও যদি প্রয়োগ করতে চায়, স্বাগত। এই গাইড লাইনে লক্ষ রাখা হয়েছে বিরল অসুখবিসুখের প্রতিও। সঠিক রোগে রোগীর সহনশীলতা মাথায় রেখে সঠিক ডোজে কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহারকে প্রাধান্য দিয়েই তৈরি হয়েছে এই গাইডলাইন। কম দামের মধ্যেও সুনির্দিষ্ট রোগে অপ্রচলিত কিন্তু কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিকের কথাও বলা রয়েছে এখানে। কোন রোগে, কখন অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার প্রয়োজন নেই— সেকথাও সুস্পষ্টভাবে বলা রয়েছে।
২০১৫ সালে মলয় দে স্বাস্থ্যসচিব থাকার সময় রাজ্যের সরকারি হাসপাতালে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার আরও বিজ্ঞানসম্মত করতে এই গাইডলাইন তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। রাজ্য, ভিন রাজ্য ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নামকরা চিকিৎসকদের পরামর্শ নিয়ে অবশেষে তৈরি হয়েছে এটি।
বর্তমানে এটি ছাপতে গিয়েছে। স্বাস্থ্যকর্তাদের হাতে চলে আসার কথা নতুন বছরের গোড়ায়। তখন স্বাস্থ্যকেন্দ্র, সরকারি হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজ মিলিয়ে কয়েক হাজার সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে এই গাইডলাইন অনুযায়ী চিকিৎসক এবং নার্সদের অ্যান্টিবায়োটিক দিতে হবে— এমনটাই জানা গিয়েছে দফতরের একাধিক শীর্ষ সূত্রে। জানুয়ারির গোড়ায় বইটির প্রথম কপি মুখ্যমন্ত্রী তথা স্বাস্থ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে তুলে দেবেন ইনস্টিটিউটের অধিকর্তা।




