কেঁচো খুড়তে কি কেউটে বেরিয়ে পড়ল? তোলপাড় দেশের রাজনীতি। এ প্রশ্ন নিয়েই।
নোটবন্দির পর মাত্র পাঁচ দিনেই জমা পড়েছিল ৭৪৫ কোটি ৫৯লক্ষ টাকার বাতিল নোট। কোথায়? না গুজরাতের জেলা কো-অপরেটিভ সেন্ট্রাল ব্যাঙ্ক আমেদাবাদে। গোটা দেশের এই ধরণের জেলা সমবায় ব্যাঙ্কগুলির মধ্যে আমদাবাদের ওই ব্যাঙ্কেই জমা পড়েছিল সর্বোচ্চ পরিমাণ নোটবন্দি বাতিল নোট। আর এই ব্যাঙ্কের ডিরেক্টর হলেন খোদ বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ।
চাঞ্চল্যকর নয়! তথ্যের অধিকার আইনে আবেদন করেই বেরিয়ে এসেছে এই খতিয়ান।
২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর নোটবন্দির কথা ঘোষণা করেছিলেন নরেন্দ্র মোদী। তার মাত্র পাঁচ দিন পরে, ১৪ নভেম্বর দেশের সমস্ত জেলা সমবায় ব্যাঙ্কগুলোতে বাতিল নোট জমা দেওয়া নিষিদ্ধ করা হয়। বলা হয়েছিল ওই ব্যাঙ্কগুলোর মাধ্যমে কালো টাকা সাদা করার চেষ্টা চলছে।আর সেই পাঁচদিনেই এত টাকা জমা পড়ে গেল খোদ অমিত শাহের ব্যাঙ্কে? স্বাভাবিক ভাবেই বিরোধীরা প্রশ্ন তুলেছেন, এর দায় কে নেবেন? ব্যাঙ্কের ডিরিক্টর হিসাবে অমিত শাহ নন? তাঁদের বক্তব্য, ধরা যাক অমিত শাহ-র পরিবর্তে ওই ব্যাঙ্কের ডিরেক্টর ছিলেন গুজরাতের প্রবীণ কংগ্রেস নেতা তথা সনিয়া গান্ধীর রাজনৈতিক সচিব আহমেদ পটেল।
এতক্ষণে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি, রেলমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল, বস্ত্রমন্ত্রী স্মৃতি ইরানিদের কি সাংবাদিক বৈঠক করতে নামিয়ে দিতেন না মোদী-শাহ?আমেদাবাদ ডিস্ট্রিক্ট কোপরেটিভ ব্যাঙ্কের ওয়েবসাইট বলছে গত সাত বছর ধরে ওই ব্যাঙ্কের ডিরেক্টর অমিত শাহ। এর আগে ২০০০ সালেও ওই ব্যাঙ্কের ডিরেক্টর ছিলেন তিনি।
২০১৭ সালের ৩১ মার্চে ওই ব্যাঙ্কে জমা থাকা মোট টাকার পরিমাণ পাঁচ হাজার পঞ্চাশ কোটি টাকা। ওই আর্থিক বছরে ব্যাঙ্কটির মুনাফা হয় ১৪ কোটি ৩১ লক্ষ টাকা।এই তালিকায় দ্বিতীয়স্থানে থাকা কোঅপরেটিভ ব্যাঙ্কও গুজরাতের। রাজকোট ডিস্ট্রিক্ট কোঅপরেটিভ ব্যাঙ্ক। সেইখানে এই পাঁচদিনে জমা পড়েছে ৬৯৩ কোটি ১৯ লক্ষ টাকারবাতিল নোট। এই ব্যাঙ্কের ডিরেক্টর হলেন গুজরাত সরকারের পূর্ণমন্ত্রী জয়েশভাই বিঠলভাই রাড়াডিয়া। এই রাজকোট থেকেই ২০০১ সালে বিধায়ক হয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদী।অথচ এই পাঁচদিনে গুজরাতের রাজ্যস্তরের সমবায় ব্যাঙ্কেজমা পড়া বাতিল নোটের পরিমাণ ছিল মাত্র এক কোটি ১১ লক্ষ টাকা।
তথ্যের অধিকার আইনে, দেশের কোঅপরেটিভ ব্যাঙ্কগুলোতে জমা পড়া বাতিল নোটের পরিসংখ্যান, আবেদনকারী মনোরঞ্জন রায়কে জানিয়েছে নাবার্ড।এই পরিসংখ্যান থেকে জানা যাচ্ছে নোটবন্দির পর রিজার্ভ ব্যাঙ্কে জমা পড়া মোট ১৫ লক্ষ ২৮ হাজার কোটি টাকার বাতিল নোটের প্রায় ৫২ শতাংশ, অর্থাৎ ৭ লক্ষ ৯১ হাজার কোটি টাকা জমা পড়েছে সাতটা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক, ৩২ টা রাজ্য সমবায় ব্যাঙ্ক এবং ৩৭০ টা জেলা সমবায় ব্যাঙ্কএবং ৩৯ টা পোস্ট অফিসে। এই সাতটা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে জমা পড়েছে ৭ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা। ৩২ টা রাজ্য সমবায় ব্যাঙ্কে ৬ হাজার ৪০৭ কোটি টাকা এবং ৩৭০ টা জেলা সমবায় ব্যাঙ্কে ২২ হাজার ২৭১ কোটি টাকা। মাত্র৩৯ টা পোস্ট অফিসে জমা পড়েছে ৪ হাজার ৪০৮ কোটি।
বাতিল নোট জমা নেওয়ার জন্য স্টেট কোঅপরেটিভ ব্যাঙ্কগুলোকে সাত সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়েছিল। সেই তুলনায় মাত্র পাঁচ দিন সময় দেওয়া জেলা সমবায় ব্যাঙ্কগুলোতে এত বেশি টাকা জমা পড়া নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকে। দেশের মোট ১ লক্ষ ৫৫ হাজার পোস্ট অফিসেরমধ্যে মাত্র ৩৯ টাতে এত টাকা জমা পড়া নিয়েও সন্দিহান অনেকে।বিশেষজ্ঞরা মনে করাচ্ছেন, ২০১৭ সালের মাঝামাঝি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময়, শরিকদের চাপে দেশের সমস্ত রাজ্য ও জেলা সমবায় ব্যাঙ্কগুলোর বাতিল নোট রিজার্ভ ব্যাঙ্কে জমা দেওয়ার অনুমতি দেয় কেন্দ্র। বিরোধীরা তখন অভিযোগ তুলেছিলেন, রাজনৈতিক নেতাদের চালানো এই ব্যাঙ্কগুলোকে এই সুবিধা দিয়ে কালো টাকা সাদা করার উপায় সহজ করে দিল কেন্দ্র।
২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর, রাত আটটার সময় জাতীয় টেলিভিশনে এসে নাটকীয় ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। কালো টাকা এবং জাল নোট আটকাতে বাতিল করে দেওয়া হয় দেশের সমস্ত পাঁচশো এবং হাজার টাকার নোট।হঠাৎ নেওয়া এই সিদ্ধান্তে দেশ জুড়ে নাস্তানাবুদ হয় আমজনতা। দেশজুড়ে দেখা যায় স্পষ্ট মেরুকরণ। কারও মতে প্রধানমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্ত যূগান্তকারী। কেউ কেউ আবার বলেছিলেন অর্থনীতির প্রবল ক্ষতি করে, সাধারণ মানুষের চরম অসুবিধা করে নেওয়া এই সিদ্ধান্তে আসলে তেমন কোনও প্রভাব পড়বে না কালো টাকায়।পরে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক জানায়, বাতিল হওয়া নোটের ৯৮.৮৬ শতাংশই জমা পড়েছে। কেন্দ্রের সরকারও নোটবন্দির এই বিরাট সিদ্ধান্তের পর দেশে কতটা কালো টাকা আটকানো গিয়েছে সেই নিয়ে এখন অবধি স্পষ্ট কোনও পরিসংখ্যান দেয়নি।
এর মাঝে খোদ অমিত শাহের পরিচালনা করা কোঅপরেটিভ ব্যাঙ্কে বিপুল পরিমাণ বাতিল টাকা জমা পড়ায় নানান প্রশ্ন সামনে চলে এলো। কালো টাকার বিরুদ্ধে বিজেপির ‘লোক দেখানো’ লড়াই প্রতিদিনই বেআব্রু হয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।




